বুধবার, ২ অক্টোবর, ২০১৩

যে বিষয় গুলো ইসলামকে ধ্বংস করে দেয়

পড়ার এবং বুঝার অনুরোধ রইলো
 

 যেসব বিষয় গুলো একজনের ইসলামকে ধ্বংস করে দেয় (মুসলিমকে কাফির বানিয়ে দেয়)

By Vai Iftekhar



[শায়খুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল অহহাব (রহ) এর বিখ্যাত "নাওয়াকিদ আল ইসলাম" এর উপর সংক্ষিপ্ত এই লেখাটা সঙ্কলিত হয়েছে শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল, ভাই আবু মুওয়াহিদ এর বিভিন্ন লেখা ও স্পিচ এবং আল ফিরদাউস ইনস্টিটিউট(লন্ডন) এর কিছু কোর্স ম্যানুয়ালের উপর ভিত্তি করে]

নাওয়াকিদ আল ইসলাম- যেসব বিষয় গুলো একজনের ইসলামকে ধ্বংস করে দেয় (মুসলিমকে কাফির বানিয়ে দেয়)

১.শিরকঃ

মানে আল্লাহর সাথে অন্য কারো অংশী স্থাপন করা। শিরকের অর্থ হল আল্লাহ সুবহানাওয়াতাআলার সাথে কাউকে সংশ্লিষ্ট করা যেমন এমনটি বলা যে- যিশু আল্লাহর পুত্র বা অমুক ব্যক্তি হল বিধানদাতা, কুফরি আইন তথা ইসলাম বিবর্জিত আইন দিয়ে শাসন করা এসবই শিরক। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, নিজের পক্ষে যুক্তি পেশ করুক বা না করুক; শিরকে আকবার করার পর একজন মানুষ ইসলামের গন্ডী থেকে বের হয়ে যায় যদি কোন আলেম তাকে এগুলো বুঝিয়ে দেবার পরও এতে সে বলবত থাকে।

আল্লাহ বলেন,

"লুকমান হাকিম তার পুত্রকে বলল-“হে আমার পুত্র, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাতে লিপ্ত হয়ো না। নিশ্চয়ই শিরক হল সর্ব নিকৃষ্ট কাজ”
লুকমান ১৩

“নিশ্চয়ই আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না কিন্ত তদাপেক্ষা ছোট সকল গুনাহ তিনি চাইলে মাফ করে দেন। আর যে ব্যক্তি শিরক করলো সে ত ধ্বংস হল”
নিসা ১১৬

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতকে হারাম করে দেন এবং আগুনকে তার বাসস্থান বানিয়ে দেন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই”
মায়িদাহ ৭২

২.আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন মাধ্যম গ্রহন করাঃ

উদাহরন স্বরুপ বলা যায় কোন মৃত ব্যক্তির কবরে গিয়ে তাকে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মাধ্যম হিসেবে নেয়া এমন কুফর যা মানুষকে ইসলামের মিল্লাত থেকে বের করে দেয়।

আল্লাহ বলেন-

“নিশ্চয়ই দ্বীন (ইবাদাত ও আনুগত্য) শুধু আল্লাহরই জন্যে নির্ধারিত। আর যারা আউলিয়া গ্রহন করে ও বলে যে আমরা ত এমনটা শুধু এজন্যেই করি যে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের মধ্যে সে বিষয়ের ফয়সালা করে দিবেন যা নিয়ে তারা বিরোধে লিপ্ত। আর আল্লাহ মিথ্যাবাদী ও কাফিরদেরকে সৎ পথ দেখান না”
যুমার ৩

আরেকটা উদাহরন হল কোন দরবেশ বা পীর ফকিরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। উলামা ও আউলিয়াদের জীবদ্দশায় তাদের নিকট দুয়া চাওয়া জায়েয কিন্ত তাদের মৃত্যুর পর কবরে গিয়ে এমনটা করা জায়েয নয় এমনকি যদি তা আমাদের নবীর (স) কবরও হয় না কেন।

আমাদের রাসুল (স) বলেনঃ
“হে আল্লাহ, আমার কবরকে ইবাদাতের জায়গা করবেন না”
“আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমনটা করো না যা খ্রিষ্টানরা করে মরইয়ামের পুত্রের ব্যাপারে। আমি আল্লাহর একজন দাস মাত্র এবং তাঁর রাসুল”
সহীহ বুখারি

৩. যে ব্যক্তি কাফিরকে কাফির বলে না অথবা তাদের কাফির হবার ব্যাপারে সন্দেহ পোষন করে অথবা তাদের দ্বীনকে সঠিক ভাবেঃ

এমন মুসলিমও দেখতে পাওয়া যায় যারা মনে করে যে কাফিরদেরকে কাফির বলে অভিহিত করা আমাদের জন্যে উচিত নয়(অথচ স্বয়ং আল্লাহ তাদেরকে কাফির বলেছেন); যদি কেউ কুফফারদের কাফির হবার ব্যাপারে সন্দেহ রাখে তবে সে কাফির হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি বলে যে খ্রিষ্টানরা কাফের না বা হিন্দুরা ঈমানদার তাহলে সে কুফর করার কারনে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।

আল্লাহ বলেনঃ

“নিঃসন্দেহে তারা কাফির যারা বলে মরইয়ামের পুত্র হল আল্লাহ”
মায়িদা ৭২

“তারা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস পোষণ করে যারা বলে -- ''নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন তিনজনের তৃতীয়জন।’’ বস্তুতঃ একক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর যা তারা বলছে তা থেকে যদি তারা না থামে, তবে তাদের মধ্যের যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের পাকড়াবে ব্যথাদায়ক শাস্তি”
মায়িদা ৭৩

“আর ইহুদীরা বলে -- ''উযাইর আল্লাহ্‌র পুত্র’’, আর খ্রীষ্টানরা বলে -- ''মসীহ আল্লাহ্‌র পুত্র।’’ এসব হচ্ছে তাদের মুখ দিয়ে তাদের বুলি আওড়ানো, -- তারা ওদের কথার অনুসরণ করে যারা পূর্বকালে অবিশ্বাস পোষণ করেছিল। আল্লাহ্ তাদের ধ্বংস করবেন। তারা কেমন ক’রে বিমুখ হয়!”
তাওবা ৩০

"আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম”
বাইয়্যিনাহ ৬

৪. এমন মনে করা যে রাসুল (স) কর্তৃক আনীত বিধান বা পথের চেয়ে অপর কোন পথ উত্তমঃ

উদাহরনস্বরুপ বলা যায় যদি কেউ মনে করে যে অমুক দেশের আইন ইসলামের আইন অপেক্ষা উত্তম অথবা দুটোই সমান সমান ভাল। তেমনি কেউ যদি বলে যে মুসলিমদেরকে শরীয়াহ এবং দেশীয় আইনকেই অবশ্যই অবশ্যই মেনে চলতে হবে তাহলে তা এমন একটি কুফর যা তাকে ইসলামের ছায়াতল থেকে বহিষ্কার করে দেয়।

“তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে, যারা তাদের জন্যে সে ধর্ম সিদ্ধ করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি”
শুরা ২১

“যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান”
নিসা ১১৫

৫. শরীয়াহর কোন হুকুমকে ঘৃনা করাঃ

যেমন কেউ যদি সালাত, হিজাব, দাওয়াহ, ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করাকে ঘৃনা করে তবে সে কাফির হবে। আল্লাহ বলেনঃ

“এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন”
মুহাম্মদ ৯

আর এমন উদাহরন মোটেও অপ্রতুল নয় যেখানে মানুষ জন নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করার পরও ইসলামের ফরয বিধান গুলো (হিজাব, জিহাদ ইত্যাদি) নিয়ে ঠাট্টায় লিপ্ত অথবা জান্নাতের হুর, দুধের নহর এসব নিয়ে রসিকতায় মগ্ন।

৬. দ্বীনের কোন বিষয় নিয়ে হাসি ঠাট্টা করাঃ

এখনকার সময়ে এ বিষয়টা খুবই চোখে পরে, মানুষজন ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে তামাশায় লিপ্ত হয় এবং তারাও নিজেদের মুসলিম হিসেবে দাবি করে; কেউ আপত্তিও করে না।

“আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর”
তাওবা ৬৫-৬৬

আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেনঃ
“তাবুকের যুদ্ধের সময়ে এক লোক ভীড়ের মাঝে বসে বলছিল- এই ক্বারী সাহেবদের মত পেটুক আর ভীতু লোক জীবনে আর দেখিনি। এরা হল সবচে বড় উদরবিশিষ্ট, সবচে বেশি মিথ্যুক জিহ্বাওয়ালা আর যুদ্ধে সবচে বেশি ভীতু। মসজিদে বসা এক লোক বলে উঠল- তুই মিথ্যা বলছিস মুনাফেক কোথাকার! আমি অবশ্যই এগুলো রাসুল (স) কে বলে দিব। অতঃপর এই কথাগুলো রাসুলের (স) কানে পৌছায় আর আয়াত গুলোও নাযিল হয়” ইবন উমার বলেনঃ “ আমি দেখলাম সেই লোকটি রাসুলের (স) উটের কাধ ধরে ছিল আর বলছিল- হে আল্লাহর রাসুল (স), আমরা ত শুধু মশকরা করছিলাম। আর রাসুল (স) সেই আয়াত গুলো(৯:৬৫-৬৬) পড়ে যাচ্ছিলেন”
ইবন কাসীর

৭. সিহর বা যাদুবিদ্যায় লিপ্ত হওয়াঃ

জ্বীনদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, যাদুকরের নিকট গমন বা তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া এসবই শিরকের প্রকরন।

আল্লাহ বলেনঃ

“সুলাইমান কখনো কুফরি করেনি, কিন্ত শয়তান কুফরি করেছে মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে....”
বাকারা ১০২

৮.কুফফারদের সাথে মৈত্রি স্থাপন করা এবং তাদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাহায্য করাঃ

মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুফফারদের সাহায্য করা, মুসলিমদের হত্যা করার জন্যে কুফফারদের লেলিয়ে দেয়া বা তাদের সাহায্য করা এমন কুফরি যা কাউকে ইসলামের মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়।

আল্লাহ বলেনঃ

“হে ঈমানদারগন! ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করে তাহলে সে তাদেরই একজন হিসেবে পরিগনিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না”
মায়িদা ৫১

“হে ঈমানদারগন! স্বীয় দ্বীনের বাইরের কাউকে বিতানাহ হিসেবে গ্রহন করো না, তারা তোমাদের পদস্খলন করাতে একটুও কুন্ঠাবোধ করবে না। তারা শুধু তোমাদের ক্ষতিই চায়। তাদের মুখে তোমাদের প্রতি ঘৃনা প্রকাশিত হয়েই গেছে আর তাদের অন্তরে যা আছে তা আরো ভয়াবহ। আর আমি ত আয়াত সমূহকে সরল ভাবে উপস্থাপন করেছি যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো”
আল ইমরান ১১৮

৯. কারো এমন বিশ্বাস পোষন করা যে মুহাম্মদ (স) এর দ্বীনের অনুসরন করতে সে বাধ্য নয় এবং অন্য দ্বীনে যাবার অনুমতি তার আছেঃ

আল্লাহ বলেনঃ

“রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহন কর আর যা থেকে বিরত থাকতে বলে তা থেকে বিরত থাকো। আল্লাহ শাস্তি দানে বড়ই কঠোর”
হাশর ৭

রাসুল (স) এর বিরোধিতা বা তাঁর কথা অপছন্দ করে মুসলিম থাকা সম্ভব নয়।

১০. দ্বীন ইসলামকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করাঃ

“আর যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অন্বেষন করে তবে তা কস্মিনকালেও গ্রহন করা হবে না আর আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”
আল ইমরান ৮৫

দ্বীন সম্পর্কে ইলম অর্জন না করা বা দ্বীনের উপর আমল না করার মাধ্যমে এটি ঘটতে পারে। ক্রমাগত ইসলামের ইলম ও আমল থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে রাখতে একটা পর্যায়ে মানুষ ইসলামের গন্ডী থেকে বের হয়ে যায়। যদি কেউ এমন বলে যে এই কাজটি হারাম বা এটি হালাল তবে আমাদেরকে অবশ্যই সে সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্যে যাচাই বাছাই করতে হবে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ) একবার নদীর তীর ধরে হাটছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন একটি ছেলে তীর ধরে এমনভাবে হাটছিল যেন সে পানিতে পড়েই যাবে। ইমাম (রহ) ছেলেটিকে বললেন- সাবধানে চলো, পড়ে যেতে পার। ছেলেটা তাকে উত্তর দিল- আপনিও সাবধানে চলুন, আর আপনি যদি ভূল করেন তাহলে বাকি সবাই সেই ভূলে পতিত হবে। ইমাম (রহ) বাড়ি ফিরে তার সকল আহকাম পুনরায় পর্যালোচনা করলেন আর বললেন- এমন ভেবো না যে আজকে আমি যা বলছি কাল সেটা পরিবর্তিত হবে না যদি আমার কথার বিপরীতে হাদিস খুজে পাই।

“তার চেয়ে বড় যালিম কে আছে যার কাছে কোন হুকুম আসার পর সে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে? নিঃসন্দেহে সে অপরাধী”
সাজদাহ ২২




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন